1. admin@somoy71.com : admin :
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:১৭ পূর্বাহ্ন

জয়িত্রী

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিত : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে

সুমিতা সরকার ঘোষঃ
বাঙ্গালীয়ানার একরাশ স্বপ্ন নিয়ে কলেজ ছাড়ল জয়িত্রী। এম. এ. র ফাইনাল ইয়ার হয়ে গেছে। হ্যাঁ নিম্ম- মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র মেয়ে জয়িত্রী সেন।

কলেজে পড়ার সময়েই তাকে চোখে লেগে যায় বিখ্যাত আইনজীবী রক্তিম চ্যাটার্জীর একমাত্র আদরের নাতি দ্বীপায়ন চ্যাটার্জীর। বাবা শ্রীমন্ত চ্যাটার্জী ভীষণ মেজাজী। ছেলেও বাবার ধারা কড়ায় গন্ডায় গুনে গুনে পেয়েছে। জয়িত্রী আর দ্বীপায়নের বাড়ির দূরত্ব খুব বেশী দূর নয়।

সংসারে অভাব থাকলেও ঈশ্বর কিন্তু নজরকাড়া রূপ দিয়েছিল জয়িত্রীকে। একদিন জয়িত্রী সেজেগুজে তার বান্ধবীর বাড়ি যাওয়ার সময় এক বাড়ির রোয়াকে দেখতে পেল কিছু ছেলে আড্ডা দিচ্ছে আর দ্বীপায়ন তার নিজের স্করপিও গাড়ির ওপরে উঠে বসে আছে। জয়িত্রীকে দেখা মাত্র হাঁ করে দেখছে। যেন সবটা এখনই নিয়ে নিতে চায়। বন্ধুরা এগিয়ে এসে বলল আমাদের বসের একটু দরকার আছে তোমার সাথে। জয়িত্রী বলল সরে দাঁড়ান, কি দরকার আমার সাথে?? বন্ধুদের মধ্যে একজন বলল জান তুমি কে ও? কি ওর পরিচয়? জয়িত্রী সঙ্গে সঙ্গে বলল হ্যাঁ জানি ধনীর দুলাল, রগচটা, জেদী, মেয়ে দেখলেই তো ঠিক থাকতে পারেনা, কি করবে আর?? দ্বীপ চুপ, একটাও কথা নেই মুখে। একথা বলে হনহন করে জয়িত্রী পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

সারারাত শুধু জয়িত্রীর কথা, মনে আর মাথায় যেন কিছু আসছেই না। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নেও শুধু জয়িত্রীকেই দেখছে। কি হয়ে গেল কয়েকদিনের মধ্যে, মন যেন আর তার নিয়ন্ত্রণে থাকতেই চাইছে না। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নেও জয়িত্রীকেই দেখছে। হাত বাড়িয়ে জয়িত্রী ডাকছে, বলছে ক্ষমতা থাকলে ধরো আমায়, নীল ওড়না আর চাঁদের আলোয় কি সুন্দর দেখাচ্ছে জয়িত্রীকে। যেন আকাশের পরী মাটিতে নেমে এসেছে। নরম নীল ওড়না যেন মূহুর্তের জন্য দ্বীপের সারা শরীর ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। যেওনা যেওনা বলে চিৎকার করতেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল দ্বীপের। কি করবে দ্বীপ?? একটা সিগারেট জ্বালতেই কানে এল পাশের ঘরে বাবা কার সাথে যেন কথা বলছে। দরজায় কান রাখতেই শুনতে পেল কাকে যেন বাবা বলছে অনেক দিন তোমাকে কাছ থেকে দেখিনি কাল পেট্রল পাম্পের সামনে ঠিক ১টার সময় থাকব, সময় মত চলে এসো। রাগে, ঘৃণায় মায়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল দ্বীপ। মাকে সবটা বলবে কিন্তু মা যদি কষ্ট পায়, থাক। বারান্দায় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সিগারেটে টান দিতে থাকে দ্বীপ আর ভাবে জয়িত্রীকে সে এতটা কিভাবে ভালবেসে ফেলল?? কদিন আগেও তো কতশত মেয়ে বান্ধবী ছিল তার। আড্ডা মারা, ডিস্কো থেক, সিনেমায় যাওয়া, শপিং মলে ঘোরা, কই কখনও তো কোন মেয়ের সম্পর্কে মন এমন উথাল পাথাল হয় নি দ্বীপের?? তাহলে কি জয়িত্রীকে ও ভালবেসে ফেলেছে?? কি করবে সে এখন?? মূহুর্তের মধ্যে সব যেন কেমন একটা জট পাকিয়ে যাচ্ছে। আর দাঁড়াতে পারছে না। ঘরে আসার সময় লক্ষ্য করল বাবার ঘরের আলো তখনও জ্বলছে। চুপচাপ ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল দ্বীপ। কাল জয়িত্রীর সাথে দেখা করে যেভাবেই হোক ওকে বলবে। কিন্তু কি করে?? জয়িত্রী তো ওর কোন কথাই শুনতে চায়না। পরদিন এক বন্ধুর থেকে নম্বর জোগাড় করে ফোন করতেই জয়িত্রীর মা ফোন ধরল বলল কে আপনি?? পরিচয় দিতেই মা বলল বড়লোকের বকাটে ছেলের সাথে আমার মেয়ে কথা বলতে চায় না, বলবেও না। ততক্ষণে বাড়ি ফিরে এসেছে জয়িত্রী। মার কথাগুলো তার কানে গেল। সেও চুপ। সত্যিই তো, বড়লোক বাড়ির একমাত্র ছেলে। তারা সে তুলনায় যথেষ্ট গরীব। আর কি বলবে দ্বীপ। কই আগের দিন তো দেখা হলো?? কিছুই তো বলেনি?? চুপ করেই তো ছিল? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই জয়িত্রী ওর ঘরে চলে যায়।

বিকেলে টিউশনে যেতেই রাস্তায় একটা ছেলে এসে ওকে চিঠি দিয়ে যায়। চিঠিতে লেখা #জয়িত্রী_আমি_তোমায়_ভালবাসি_তোমাকে_ছাড়া_আমার_পৃথিবী_অন্ধকার।

কথাটা শুনেই জয়িত্রীর মাথা ঘুরতে লাগল। কি বলে এই ছেলে?? ধনীর দুলালের এ কি অবস্থা?? এসব ভাবতে ভাবতে ছাত্রের বাড়ি চলে যায় জয়ী। ফেরার পথে দ্বীপ তাকে রাস্তায় একা পেয়ে বলে, চিঠির সব লেখাটা নিশ্চয়ই পড়েছ?? তোমার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম। জয়ী বলে ভেবে দেখব। তাছাড়া তোমাকে আমার বাড়ির কেউ কোনোদিন ও পছন্দ করেনি, আজও করবেনা। আমাদের মত চারটে ফ্যামিলি কিনে রাখার ক্ষমতা আছে তোমাদের। দ্বীপ বলে তাতে কি?? আমি তোমাকে ভালবাসি, এর সাথে আমার বাবা, মায়ের কি সম্পর্ক?? জয়ী বলে আমার মা, বাবা তোমার বাড়ির লোককে পছন্দ করে না। দ্বীপ বলে, তুমি আমায় পছন্দ কর তো জয়ীত্রী?? জয়ী কোন উত্তর দেয়না। শুধু বলে আমার মা, বাবাকে আমি সম্মান করি। মা, বাবার অবাধ্য হয়ে কোন কাজ কোনদিন করিনি বলে জয়িত্রী জোরে পা বাড়িয়ে বাড়ির রাস্তা ধরে।

কি করবে এখন দ্বীপ?? কোন উত্তর খুঁজে পায়না। জয়িত্রীর ঠিকমতো মত নেই। ওর মা, বাবাও দ্বীপকে আর ওর বাড়ির লোককে ধনী বলে পছন্দ করেনা, জোর করে তুলে এনে বিয়ে করলে যদি হিতে বিপরীত হয়, জয়ী ভুল বুঝে ওকে আরও ঘৃণা করে?? না না, সেটা মোটেই ঠিক কাজ হবে না, প্রত্যাখ্যান মোটেই সহ্য হবেনা দ্বীপের, তাও আবার জয়ীর কাছ থেকে আসা প্রত্যাখ্যান। কয়েকটা দিনে তাকে যেন সময় আপাদমস্তক বদলে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন জয়িত্রীকে আর দেখা যায় না। সে মামার বাড়ি গিয়েছিল। কদিন দেখতে না পেয়ে দ্বীপের প্রাণ যেন হাঁসফাঁস করতে থাকল। আজ রবিবার, জয়িত্রী ফিরেছে মামার বাড়ি থেকে। বিকেলে পড়াতে যাওয়ার সময় দ্বীপ পথ আটকাল। আজ তোমাকে হ্যাঁ বলতেই হবে। কোন কথা শুনব না। জয়িত্রী বলল তুমি কেন এরকম কর?? তুমি নিজেকে বদলে ফেললেও মা, বাবার মনে তোমার প্রতি একটা বাজে ধারণা জন্মে আছে, ওরা কেউ তোমাকে বিশ্বাস করবে না। আর তুমি?? তুমি আমায় বিশ্বাস করো তো জয়ী?? মাথা নীচু করে জয়ী বলে আমার বাবা, মায়ের মতই আমার মত। ইচ্ছে থাকলেও ওদের অসম্মান আমি কোনদিন করিনি। চারদিকে ছেলেদের চরিত্রের যা অবস্থা?? মাত্র কয়েক দিনের আলাপে কাকে বিশ্বাস করব?? বাড়ি ফিরে দ্বীপ কারো সাথে কথা না বলে না খেয়ে শুয়ে পড়ে। মা জিজ্ঞাসা করতে এলে মাকে সবটা বলে। মা সব শুনে বলে তুই ওকে নিজের কাছে নিয়ে আয়। তোর বাবা, ঠাকুর্দা টাকা,বংশ মর্য্যাদা আভিজাত্য আর ইগোর লড়াইয়ের অহংকারে কোনও দিনও মেনে নিতে চাইবেনা কিন্তু আমি রাজী আছি। দ্বীপ কি করে মাকে বলবে যে জয়ীর জন্য তার অন্তরে উথাল-পাতাল চলছে কিন্তু মেয়েটা তো সেভাবে রাজী নয়, তার বাবা, মায়ের অমতে গিয়ে কোন কাজই করবেনা সে?

সপ্তাহ খানেক যাবার পর একদিন টিউশান যাবার পথে জয়িত্রী জানায় রেলে সার্ভিস করা নির্মাল্য বোসের সাথে তার বিয়ের ঠিক করেছেন বাবা, মা। এক সপ্তাহ পর বিয়ে। রাগে, দুঃখে, ঘৃণা, অপমান,লজ্জায় বন্ধুদের সামনে কিভাবে মুখ দেখাবে, ভেবে পায় না দ্বীপ। বন্ধুদের মধ্যমণি, তাদের আদর্শ, ধনী, অভিজাত পরিবারের শ্রীমন্ত চ্যাটার্জীর একমাত্র ছেলে, রক্তিম চ্যাটার্জীর আদরের নাতি, যার নেশা ছিল প্রতিদিন বিভিন্ন মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করা, আজ সে কিনা এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের এক সাধারণ মেয়ের কাছে হেরে গেছে। নিজের প্রতি ধিক্কার জন্মায় দ্বীপের। কিন্তু হাজার চেষ্টা সত্বেও কিছুতেই তো ভুলতে পারছে না জয়িত্রীকে, কেন?? কেন?? কি হলো দ্বীপের??

কি করবে দ্বীপ?? জয়ীর মা তো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ঐ পরিবারের সাথে তারা কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না। জয়ীও বলেছে মা, বাবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু সে করতে পারবেনা, তবে ভালবাসাটা কি একতরফা হয়ে গেল?? সাত – পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন দু চোখের পাতা লেগে গিয়েছিল দ্বীপের।

এমনি ভাবেই মাঝের কটা দিন পার হয়ে যায়। আজ সোমবার জয়ীর বিয়ে। সকাল থেকে উলুধ্বনি আর শাঁখের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে দূর থেকে। শাঁখের আওয়াজ নয় যেন প্রতিটা আওয়াজে কেউ পেরেক পুঁতে দিচ্ছে দ্বীপের বুকে। দুপুর হলো, ক্রমে ক্রমে, এখন বুঝি গায়ে হলুদ?? আর স্নানপর্ব চলছে?? কি সুন্দরই না লাগছে তার জয়ীকে?? চোখে জল এসে যায়, মনের মধ্যে ক্রমশ টানাপোড়েন চলে। জয়ী একটু একটু করে অন্যের হয়ে যাবে, যাচ্ছে, কি করে মেনে নেবে এসব দ্বীপ?? শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরার মধ্যে যেন দ্বন্দ্ব চলছে। শরীর আর মন কোনটাই কাজ করতে চাইছেনা আর। সিগারেট ধরিয়ে ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে বসল দ্বীপ, আজ সিগারেটের ছাই মিশিয়ে খাবে ও যাতে বেশী নেশা হয়, নিজেকে বড্ড পাগল পাগল লাগছে। মা সবটা বুঝতে পেরে ছেলের মাথায় স্বান্তনার হাত রাখলেন। যেখানে দ্বীপ জানে মেয়ের বাড়ির লোক ওদের মত বড়লোকের সঙ্গে সম্পর্ক করতে চায়না তবুও মনকে স্বান্তনা দেওয়ার জন্য বলে মা?? একবার কি পারতেনা তুমি, বাবা, দাদু, মিলে জয়ীদের বাড়ি বিয়ের কথাটা বলতে যেতে?? মা উত্তরে বলেন তোর দাদু, বাবাকে তো চিনিস?? বংশ- মর্য্যাদা, অর্থ, আভিজাত্য, ইগো, এগুলোই ওদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়, তাই আখেরে কোন লাভই হতো না। দ্বীপ ভাবছিল কিছুদিন আগে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শোনা কথা গুলো মাকে বলবে কি না?? তারপর ভাবল নিজের জীবন তো ভেঙ্গেই গেছে, থাক ওদের জীবনটা না হয় পূর্ণই থাকল। কথাগুলো বলেই মা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। দ্বীপ ওয়াইনে ডুবিয়ে দেয় নিজেকে।

আস্তে আস্তে গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যে নামল। কনে সাজানো, মালাবদল, শুভদৃষ্টি, সাতপাক, সিঁদুর দান, এক একটা পর্ব মনে করে দ্বীপের যেন পুরো পৃথিবীটাই ক্রমশঃ থমকে যাচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে এসব ভাবতে ভাবতে দেখল দূরে দাদু এগিয়ে আসছে, এদিকে তার শরীরও টলছে নেশায়, এমন অবস্থায় দেখে ফেললে মুশকিল, কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারে, পরদিন আবার কৈফিয়ৎ চাইবে। এসব ভেবে দ্বীপ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। সবার সঙ্গে লড়াই করা যায় কিন্তু নিজের বিবেকের সঙ্গে?? এখানেই মানুষ জেরবার, হেরে ভুত।
কি করবে? আর কি করবেনা? দুইয়ের দ্বন্দ্বে তখন দ্বীপের বড়ই বেসামাল অবস্থা। চোখে অজস্র জল ঝরে পড়ছে। বাইরে শ্রাবণ, অন্তরে শ্রাবণ, চোখে তার বহিঃপ্রকাশ।

অপর দিকে জয়ী বিয়ের পিড়িতে বসেছে ঠিকই মন যেন তার ঠিক সায় দিচ্ছে না। এই প্রথম যেন কিছু একটা ঠিক ঠাক হচ্ছে না, বুঝতে পারে সে। কিন্তু ততক্ষণে তো সব প্রস্তুত। কিই বা করত সে? ছোটবেলা থেকে মা, বাবার মুখের ওপর কোন কথা কোন দিন বলেনি সে। অনেক কষ্টে মায়ের গয়না বিক্রি করে আর কিছুটা ধার দেনা করে বিয়ের এটুকু আয়োজন করেছে তারা। কি করে জয়ী জানাবে যে দ্বীপদাকে সেও একটু মনে মনে ভালবেসেছে। যেখানে বাবা,মা, তাকে পছন্দই করেনা। একদিকে নিজের মনের অন্তর্দ্বন্দ, অন্য দিকে সম্পর্কের ঋণ?? এসব ভাবে ভাবতেই জয়ী যেন অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে গেল।
বিয়েতে সে শুধু নামেই বসে আছে, মন ঠিক ভুলের বিচারে ব্যাস্ত। মেয়েরা কি কখনও কোনদিনও নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না?? মাথার ওপর সব সময় কি অভিভাবকত্ব কাজ করবে?? সম্বিৎ ফেরে পুরোহিতের কথায়, “মা, হাতটা হাতের ওপর দাও?? চোখের কোণায় কোথায় যেন জল চিকচিক করছে, কোন রকমে তাড়াতাড়ি আড়াল করে মুছে ফেলল জয়ী। কি করছে এখন দ্বীপদা?? শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিন বড্ড কড়া কড়া কথা শুনিয়ে এসেছে সে। কি করবে? দ্বীপও যে পাড়ায় মেয়েবাজ বলে নাম কুড়িয়ে ছিল। বড়লোকের ছেলে, অগাধ টাকা- পয়সার মালিক, গাড়ী, বাড়ি, রাজপ্রাসাদের মত ঘর, রূপেও কিছু কম ছিল না। শেষ দিন জয়ী দ্বীপকে দেখেছিল কালো জিন্স, সাদা শার্ট, ঠোঁটে সিগারেট, মনে হচ্ছিল স্বয়ং রাজপুত্র যেন এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। শেষ বারের মত হাত দুটো ধরে বলেছিল দ্বীপ আর একবার আমার কথাটা ভাবতে পারনা জয়ী?? তোমার বিয়ে হয়ে গেলে আমি আর বাঁচব না দেখো। জবাবে জয়ী বলেছিল ভাল মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিও। এখন জয়ূ ভাবছে, আচ্ছা, দ্বীপদার কি দোষ ছিল?? জন্ম থেকেই সে টাকার মধ্যে মানুষ, তাই লাগামছাড়া জীবন যাত্রায় অভ্যস্থ ওকেও তো কাছ থেকে ঠিক করার কেউ ছিল না। কাজটা কি ঠিক করল জয়ী?? এসব ভাবতে ভাবতে লক্ষ্য করল বর নির্মাল্য কখন যেন জয়ীর দিকে আড় চোখে তাকিয়ে আছে। জয়ীর সুন্দর মুখ খানা যেন আস্ত গিলে খাবার অপেক্ষায়। চোখ নামিয়ে নেয় জয়ী। সিঁদুর দান হয়ে যাবার পর আস্তে আস্তে বাসর ঘরের দিকে এগিয়ে যায় জয়ী।

বিয়ের আসরে বসে বসে জয়ী যে কিছু চিন্তা করছিল নির্মাল্য সেটা বুঝে নেয়। বাসরে একটাও কথা বলেনা নতুন বৌয়ের সাথে। কনকাঞ্জলি দেবার সময় অঝোরে কাঁদতে থাকে। এই প্রথম মা, বাবাকে, ছেড়ে একা চলে যাচ্ছে দূরে কোন বাড়িতে চিরদিনের জন্য। মা, বাবাকে ছেড়ে বেশীদিন কোথাও গিয়ে থাকেনি, মাঝে মধ্যে মামার বাড়ি ছাড়া। মা, বাবা, অলক্ষ্যে কোথাও দ্বীপদার জন্যও এই প্রথম চোখে জল এল তার, সব কান্না মিলেমিশে এক হয়ে গেল, ভাগ্যিস নির্মাল্য কিছু বুঝতে পারে নি, ভেবেছে হয়ত বাবা, মাকে ছেড়ে যাবার জন্যই চোখে এত জল। কোনক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে গাড়ীতে উঠে বসে জয়ী। দ্বীপদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় লক্ষ্য করল দ্বীপকে কোথাও দেখা যাচ্ছে কি না?? চারতলা বাড়িতে যেন শূন্যতা বিরাজ করছে। কোথাও কোন শব্দ নেই। জয়ী গাড়িতে বসে ভাবছে আজ এই বাড়িতে তার রাণী হয়ে থাকার কথা। তা না করে কোথায় কোন দূরে সে চলে যাচ্ছে। পাড়ার মধ্যে থাকলে অন্ততঃ বাবা, মাকে দুবেলা দেখতে পেত। মনে হচ্ছে গাড়ী থেকে নেমে সব বাঁধন ছিন্ন করে চলে যাবে দ্বীপদার কাছে। বলবে আমি এসেছি। আমার না বলা সব অপরাধ তুমি ক্ষমা কর। কিন্তু না তা তো আর হবার নয়। আচমকা নির্মাল্য বলে ওঠে গাল থেকে হাতটা নামাও, কি এত ভাবছ?? কাল থেকে?? জয়ী বলে কিছু না, মা, বাবার কথা, আসলে ওদের ছেড়ে বেশীদিন কোথাও থাকিনি তো? নির্মাল্যর গন্তব্য স্থল এসে গেছে। বাড়ির সামনে এসে গাড়ী দাঁড়ায়। শাশুড়ী বরণের থালা হাতে করে এসে বরণ করে। ঘরে ঢোকে জয়ী। কালরাত্রি পেরিয়ে আজ বৌ- ভাত। এ বাড়িতে বৌয়ের থেকে বেশী প্রিয় জিনিসপত্র। কে কি দিয়েছে? বৌ এর বাপের বাড়ি থেকে তত্ত্বে কি শাড়ী এসেছে?? কেমন, কোন কোয়ালিটির?? সেসব নিয়ে টানাটানি চলছে। জয়ীর প্রতি কারও কোনও খেয়াল নেই। রাত বাড়ল, সমস্ত অতিথি, অভ্যাগতরা চলে যাবার পর ফুল সাজানো ঘরে পাঁচ মিনিটের জন্য আসে নির্মাল্য। তারপর কাজ আছে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আজ তাদের জীবনে একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দিন, কিন্তু এরকম ব্যবহার কেন করছে নির্মাল্য?? পরপর এরকম করে কিছু দিন চলার পর একদিন জয়ী আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করে কোথায় যাও তুমি প্রতি রাতে?? নির্মাল্য বলে আমি অন্য কাউকে ভালবাসি, সেখানে আমার কথা দেওয়া আছে, তার কাছে আমাজে প্রতিদিন যেতে হয়। বাবা, মায়ের অনুরোধে এই সামাজিক বিয়েটা আমি করতে বাধ্য হয়েছি। এমনিতে বাড়ীর সবাই ব্যপারটা জানে প্রতিবেশীদের মুখ চাপা দেবার জন্যই আমাকে বিয়েটা করিয়েছে, কেউ যেন তোমার মুখ থেকে কথাটা না জানে। মানে তুমি যে জেনেছ সেটা কাউকে বোলোনা কখনও। কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না জয়ী। জ্ঞান হারিয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ে জয়ী। বিন্দু মাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে সোজা তার গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায় নির্মাল্য। রাতগুলো প্রতিদিন একাই কাটাতে হয় জয়ীকে। পরদিন সকালে স্নান সেরে পুজোর ঘরে যায় জয়ী। পুজো দিতে দিতে মনে মনে ভাবে, বাবা, মা এ কেমন বিয়ে দিল তার?? এতো হাত, পা বেঁধে জলে ফেলে দেওয়ার সামিল। দ্বীপদা তো এর চেয়ে অনেক ভাল ছিল, অন্তত তাকে প্রাণ ভরে ভাল তো বাসত?? প্রথম জীবনে একটু লম্পট ছিল কিন্তু পরে তো নিজেকে শুধরে নিয়ে জয়ীকে অসম্ভব ভালবেসে ফেলেছিল। কেন জয়ী বাবা, মায়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে রাজী হলো না?? তা হলে তো এদিন গুলো আর দেখতে হতো না?? শাশুড়ী ঘরে ঢুকে বলে এই যে, ” পাটরানী?? বলি এখানে বসে থাকলেই চলবে?? না রান্নাঘরে গিয়ে বাকী কাজগুলোও সারতে হবে?? কে করবে বাকী কাজ?? নতুন বৌয়ের সাথে এ কেমন ব্যবহার??

বাড়িতে তিন ননদ, দুই দেওর, দুই ভাসুর, আর শ্বশুর শাশুড়ী। প্রথম আসা থেকেই কেউ ভাল করে কথা বলছেনা তার সাথে। কিন্তু কেন?? তার কি অপরাধ?? বাড়ি থেকে দামী জিনিস তত্ত্বে পাঠানো হয়নি বলে? কিন্তু ছেলের বাড়ির লোক তো পাকা কথার সময় জেনেছিল তাদের অবস্থা বিশেষ ভাল নয় তবে?? ননদেরাও কেমন যেন মুখ ঘুরিয়ে চলছে তার দিক থেকে, হয়ত মায়েরই নির্দেশ।

এভাবে টানা ১ বছর কেটে যায়। আজ জয়ী একটা যন্ত্র মানবে পরিণত হয়েছে। কেউ তার সাথে ভাল ব্যবহার করে না। স্বামীও এড়িয়ে চলে। মাঝে মাঝেই তার দ্বীপ দার কথা মনে পড়ে। কেমন আছে দ্বীপদা?? আরও বেশ কিছু দিন পর হঠাৎ একদিন নির্মাল্য ডিভোর্স পেপার নিয়ে আসে। বলে এখানে সই করে দাও। মুখ বুজে সই করে দেয় জয়ী, কারণ যে বাড়িতে তার কোন সম্মান নেই কি হবে সেখানে থেকে?? সে নিজে যদি ডিভোর্স চাইত হয়ত নির্মাল্য দিত না আর জয়ীর মা, বাবাও জয়ীকেই দোষারোপ করত যে, সে মানিয়ে থাকতে পারেনি। এখন দোষটা নির্মাল্যর ওপরেই পড়বে, কারণ সে নিজেই আর জয়ীর সাথে থাকতে চায় না। মনে মনে ঈশ্বরকে হাজার ধন্যবাদ জানাল সে, নরক যন্ত্রণা থেকে যেন মুক্তি পেল।

ট্যাক্সি ধরে আসতে আসতে দ্বীপদের বাড়ির দিকে একবার তাকাল জয়ী, না, তেমন কোন পরিবর্তন চোখে পড়ল না তার। বাড়িতে ঢোকা মাত্র কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল মায়ের কোলে। সবটা শুনে মা বলল, ভাল করেছিস চলে এসে, না এলে ওরা হয়ত তোকে প্রাণে মেরে ফেলত, বাঁচতে দিত না তোকে। ও বাড়ির লোকের সাথে পাওনা, হিসেব সব বুঝে নিয়ে তুই তোর জীবন আবার নতুন করে শুরু কর, এম.এ পাশ করা মেয়ে তুই, কারও চেয়ে কম যাসনা। পড়াশোনায় বরাবর ভাল ছিল জয়ী। ভাবল, এবার বাড়িতে কোচিং সেন্টার খুলবে। হঠাৎ কেউ একজন এসে খবর দেয় দ্বীপ খুব অসুস্থ। সারাদিনের কাজকর্ম সেরে বিকেলে বেরিয়ে পড়ে জয়ী, মাঝপথে দ্বীপের একজন বন্ধুর সাথে দেখা, সেও দ্বীপকে দেখতে যাচ্ছে। কি হয়েছে দ্বীপের?? জিজ্ঞেস করতে বন্ধুটি বলল, আমিও জানি না, শুনলাম ও অসুস্থ, তাই দেখতে যাচ্ছি, তোমার বিয়ের পরে পরেই ও যেন কেমন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আমাদের সাথে আর আড্ডা দেয় না, গল্প করে না, আসেই না এদিকে। সারাক্ষণ বাড়ির ভিতরেই থাকে। দ্বীপের বাড়ি এই প্রথম পা দিল জয়ী। বাড়ি তো নয় যেন রাজপ্রাসাদ। দূর থেকে দেখল চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে দ্বীপ আধশোয়া অবস্থায়, হাতে একটা সিগারেট জ্বলছে। ঘরের দরজা খোলাই ছিল। পা টিপে টিপে জয়ী কাছে গিয়ে হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে বলল, তুমি এখনও এত সিগারেট খাও দ্বীপদা? এবার তো একটু নিজের দিকে তাকাও?? চোখ বন্ধ করেই দ্বীপ ভাবছে এ কার গলা? এ গলা তো তার অতি চেনা?? জয়ী?? না কি সে স্বপ্ন দেখছে?? চোখ খুলেই সামনে দ্যাখে জলজ্যান্ত জয়িত্রী সেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে। সোজা হয়ে কোনমতে দাঁড়িয়ে নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে বন্ধুর সামনেই জড়িয়ে ধরে জয়ীকে। জয়ী লজ্জা পেয়ে সরে দাঁড়ায়, আস্তে ধরে বসিয়ে দেয় খাটের ওপর দ্বীপকে। কি হয়েছে তোমার দ্বীপদা?? শরীরটা ঠিক নেই, শারীরিক, মানসিক অযত্নে শরীর ভেঙ্গে পড়েছে। মনের ওপর দিয়ে তো কম ঝড় গেল না?? পাশ থেকে বন্ধু বলে আমাদের দাদা সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছে নিজেকে, কোন মেয়ের দিকে আর চোখ তুলে তাকায় না। আমাদের সাথেও আর মেলামেশা করে না। সব সময় ঘর, কম্পিউটার আর সিগারেট।

তারপর তুমি কি মনে করে?? বাপের বাড়ি বেড়াতে এসেছ বুঝি?? জয়ী বলে, না দ্বীপদা, আমি ডিভোর্স পেপারে একেবারে সই দিয়ে এসেছি। ও বাড়ি আর ফিরে যাব না। আনন্দে দ্বীপের চোখে জল চলে আসে। বলে সত্যি বলছ জয়ী?? এখন থেকে তুমি শুধু আমার। জয়ী হাসে, বলে, আমাদের সমাজে ডিভোর্সী মেয়েদের কোন জায়গা হয় না। বাকী জীবন শুধু বাবা, মায়ের বোঝা হয়ে, সমাজের লাথি, ঝাঁটা আর লোকেদের কথা শুনে বেঁচে থাকতে হয় দ্বীপদা। মুখে হাত চাপা দিয়ে চুপ করিয়ে দেয় দ্বীপ জয়ীকে। জয়ী লক্ষ্য করে দ্বীপের হাতের আঙ্গুল গুলো এখনও তেমন সুন্দর। ডান হাতের মধ্যমায় একটা বড় প্রমাণ সাইজের হীরের আংটি। আর গলায় চার ভরির সোনার চেন দ্বীপকে আরও যেন বেশী সুন্দর করে দিয়েছে। এখন থেকে রোজ আমি আসব দ্বীপদা, যতদিন না তুমি সুস্থ হচ্ছ।

জয়ী আবার বিকেলে রোজ টিউশান পড়াতে শুরু করেছে। যাওয়ার পথে আধঘন্টা দ্বীপদের বাড়ি এসে ওকে রোজ দেখে যায়। নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে যায়। এরকম এক দিন খাওয়াবার সময় হঠাৎ দ্বীপের মা ঘরে ঢুকে দ্যাখে জয়ী দ্বীপকে পরম যত্নে খাওয়াচ্ছে। মা এক মূহুর্তে ভেবে নেয় তার ছেলেকে এই মেয়েই সুখে রাখবে। যে ছেলে এই এক বছর, সিগারেট, ওয়াইনে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতো, সে ছেলের মুখে যে হাসি ফুটেছে তাই দেখেই মা শান্তি পেল। কাছে এসে বলল, তুমি বুঝি জয়ী?? পারবেতো?? আমার দ্বীপকে ভাল রাখতে?? জয়ী লজ্জায় মাথা নীচু করে সম্মতি জানায়। তারপর বলে আমি আজ আসি দ্বীপদা, বড্ড দেরী হয়ে গেল। মা বলে খুব তাড়াতাড়ি তারা কথা বলতে যাবে মেয়ের বাড়িতে। জয়ী আর দ্বীপকে এক করতে হবে। ছেলেটার জীবন নিয়ে বড়ো ছিনিমিনি খেলা হয়ে গেছে যেন। দ্বীপের বাবার ঠাকুর্দার ইচ্ছে না থাকলেও ছেলের দিকে তাকিয়ে অবশেষে বৌয়ের কথায় রাজী হলেন শ্রীমন্ত চ্যাটার্জী আর রক্তিম চ্যাটার্জী। একে তাদের চেয়ে অর্থে কমজোরী, অন্যদিকে ডিভোর্সী মেয়ে। কিন্তু রোজ এসে দ্বীপের দেখাশোনার কথা শুনে অবশেষে রাজী হয় দ্বীপের বাবা শ্রীমন্ত চ্যাটার্জী।

যথাসময়ে দু বাড়ীর মধ্যে কথাবার্তা সম্পন্ন হয়। ছেলের বাড়ির লোকেরা বলে, চিন্তার কোন কারণ নেই, জয়ীকে তারা মাথা থেকে পা পর্যন্ত সোনা দিয়ে মুড়িয়ে ঘরে নিয়ে যাবে। অবশেষে বিয়ের দিন আসে। সকাল থেকেই দু বাড়িতে আজ জোর উৎসব লেগেছে। দ্বীপের মনে খুশীর সীমা নেই আজ। জয়ীও তার বাড়িতে বসে সাত, পাঁচ ভাবছে। এ বারেও সুখ হবে তো তার জীবনে?? দ্বীপের জীবন সে নিজেই তো নষ্ট করে দিয়েছে।

গায়ে হলুদ, স্নানপর্ব সেরে ক্রমে কনে সেজে বসা। আস্তে আস্তে সন্ধ্যে পেরিয়ে আসে শুভ লগ্ন। দ্বীপ আজ যেন একটু বেশীই খুশী। জয়ী চিরজীবনের মত তার হতে চলেছে। দ্বীপদের বাড়ি পঞ্চশায়র আজ আলো আর ফুলের মালায় সেজে উঠেছে। ঝলমল করছে পুরো বাড়িটা। যথাসময়ে বর বেশে শুভদৃষ্টির জন্য এসে দাঁড়ায় দ্বীপায়ন চ্যাটার্জী। জয়ী অবাক হয়ে দেখে কি সুন্দর লাগছে দ্বীপকে। ৬ ফুট ২ ইঞ্চির দ্বীপায়ন চ্যাটার্জী, রাজকীয় ধুতি, পাঞ্জাবী, গলায় মোটা সোনার চেন, হাতে হীরের আংটি, ডান হাতের কব্জীতে সোনার ব্রেসলেট। মনে হচ্ছে যেন রাজপুত্র, অন্য দিকে দ্বীপও দেখছে লাল টুকটুকে বেনারসীতে অপূর্ব লাগছে তার জয়ীকে। একে একে বিবাহের সব পর্ব অতিক্রম করে সিঁদুর দান সম্পন্ন হলো। মোটা লাল চওড়া সিঁদুরে জয়ীকে আজ ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। এই বোধ হয় ঠিকঠাক একটা গতি হলো জয়ীর। বাসরে হাসি, ঠাট্টা পর্ব চলল সারা রাত ধরে। পরদিন বিভিন্ন কাজ শেষ করে জয়ী দ্বিতীয় বার কনকাঞ্জলি দিচ্ছে, আর মনে মনে ভাবছে, মা আর যেন ঋণের বোঝা নিয়ে নতুন করে ফিরে আসতে না হয়।

শাশুড়ী হাসি মুখে তার ঘরের লক্ষীকে বরণ করে নেয়, ভাবে দ্বীপকে এবার একটু শান্তিতে দেখবে। কালরাত্রি পেরিয়ে অবশেষে পরদিন বৌভাত এল। চ্যাটার্জী বাড়ির বৌ বলে কথা। সোনায় অঙ্গ ঢেকে গেল জয়ীর। গলায় মোটা মোটা হার আর বেনারসীর ভার যেন বড্ড ভারী, বইতে পারছে না আর জয়ী। অপেক্ষা আর কিছুক্ষণের। আত্মীয়-স্বজন সবাই জয়ীর রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। দীঘল বড় টানা টানা চোখ, হাঁটু ছাড়ানো চুল, মুখ খানা ভারী মিষ্টি লক্ষী প্রতিমার মত, সবাই এই বলতে বলতে চলে গেল। সবাই চলে গেলে বাড়ির সামনে চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু হলো। অবাক হয়ে জয়ী ব্যালকনিতে এসে দেখে তার প্রাক্তন স্বামী নির্মাল্য বোস দু চার জনকে সঙ্গে নিয়ে এসে অশ্রাব্য বাজে ভাষায় গালি-গালাজ করছে, জয়ীর বিয়ের খবর লোকমুখে জানতে পেরে, কারণ জয়ীর সুখ তো তার কাম্য নয়। ভয় পেয়ে দ্বীপকে সব জানায় জয়ী। দ্বীপ বলে, ওসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। সব কিছু দেখার জন্য লোক আছে। শ্রীমন্ত চ্যাটার্জী ধুতির কোঁচা হাতে ধরে সিকিওরিটিদের ডেকে বলেন যারা এসে গন্ডগোল করছে, ঘাড়ধাক্কা দিয়ে যেন তাদের বের করে দেওয়া হয়। প্রয়োজনে পুলিসকে ইনফর্ম করা হয়। সিকিওরিটি তাদের কাজে লেগে পড়ে। মূহুর্তে সব চুপ হয়ে যায়।

এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল জয়ী। জয়ীকে দুহাতে কোলে করে এনে সযত্নে বিছানায় রাখে দ্বীপ। ঘরের দরজা বন্ধ করে। আলোয়, ফুলের ❀ মিষ্টি সুঘ্রাণে, চাঁদের জ্যোৎস্নায় ভাসছে গোটা ঘর। জয়ী আর দ্বীপ, আর কেউ নেই, দুজনে শুধু দুজনের। দ্বীপের বুকের ওপর মাথা রেখে জয়ী বলে, পারবেতো?? আমাকে এরকম করে আগলে রাখতে সারাজীবন?? দ্বীপ বলে, একবার তো ভরসা করেই দেখো?? সাক্ষী শুধুই রজনীগন্ধা। দ্বীপ জয়ীর রূপ আর ভালবাসায় হারিয়ে ফেলে নিজেকে। চ্যাটার্জী পরিবারের একমাত্র আদরের বৌ জয়িত্রী চ্যাটার্জী মনে মনে ভাবছে, এটা সত্যি না কি স্বপ্ন?? তার কপালে এত সুখ ছিল?? দুজনে তখন উপভোগ করছে গোটা সুখের রাত আর পিছনে ফেলে আসা নরকসম উচ্ছিষ্ট জীবন। দুহাতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বুকে, আর হারিয়ে যায় একে অন্যের মনের মধ্যে…………..

কখনও কখনও সুখ এসে হঠাৎই ধরা দেয় সময়ের সাথে নিঃশব্দে পা ফেলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

প্রযুক্তি সহায়তায় ইন্টেল ওয়েব